যখন ছোট ছিলাম

আমার ছোটবেলায় দীপাবলি আর কালীপুজোর একটা অন্যরকম রেশ ছিল। আজ থেকে আঠেরো কুড়ি বছর আগে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ এখনের মতো জাঁকজমকপূর্ণ না হয়ে উঠলেও উৎসবের মেজাজে কখনও কোনো কমতি মনে হয়নি।

আমার তখন বছর সাত আটেক। কালীপুজোয় মামাবাড়ি যাওয়াটা একপ্রকার নিয়ম হয়ে গেছিল বলা চলে। মজার ব্যাপার এই যে আমার মামাবাড়ি এবং আমার নিজের বাড়ি দুটিই একই শহরে, মিনিট পনেরো হাঁটা দূরত্ব। তাই বাকীদের মতো বছরে একবার বা দুবার মামাবাড়ি গিয়ে মাসখানেক কাটিয়ে আসার সৌভাগ্য আমার হতোনা কারণ আমি চাইলে রোজই যাওয়া যেত, কিন্তু এর জন্যে আদরে কমতি আসেনি কখনোই, বরং সময়ের সাথে তা বেড়েছে বললেও বাড়িয়ে বলা হয়না। তা যেটা বলছিলাম, কালীপুজোর আগের দিন মানে ভূতচতুর্দশীর দিন বিকেল বিকেল আমি আর মা ব্যাগ গুছিয়ে পৌঁছে যেতাম, আর ফেরা সেই ভাইফোঁটা কাটিয়ে।
ভূতচতুর্দশীর বিকেলে দিদার টিনের ট্রাঙ্ক থেকে বের হতো মাটির ডিবরি। ডিবরি জিনিসটা অনেকটা কুপির মতো দেখতে। তারপর মামাবাড়ির খোলা ছাদটায় দিদা আর মা মিলে বসে চলত সেইসব পরিষ্কার করা, তাতে তেল ভরা, সলতে পাকিয়ে পরানোর পালা। আমি দিদার গা ঘেঁষে বসে দেখতাম আর যেই বীরবিক্রমে দু-একবার হাত লাগাতে যেতাম, অমনি মা বাধা দিত, “রেখে দে তুই পারবিনা, গায়ে তেল ফেলে একাকার করবি।” তারপর যখন ছোটো হতে থাকা বিকেলটার আলো পড়ে আসত আস্তে আস্তে, তখন ভূতচতুর্দশীর সন্ধ্যেয় ছাদ আলো করে জ্বলে উঠত সেই সব ডিবরি, গুনে গুনে ঠিক চোদ্দটা। যা কিছু অশুভ, সব অন্ধকার তা সেই আলোয় যেন ম্লান হয়ে যেত। আর সেদিন চোদ্দ শাক খাওয়াটা কিন্তু মাস্ট। সন্ধ্যের পরে আমি আর আমার মামাতো দাদা ছোটমামার সাথে বেরিয়ে পড়তাম বাজি কিনতে। ছোটমামা ভীষণ মাই ডিয়ার একজন মানুষ। আমাদের ভাইবোনদের যা কিছু আবদার মেটানোর একটা নির্ভরযোগ্য স্থান। তখন বাজির উপরে তেমন নিষেধাজ্ঞা ছিলনা। ফুলঝুরি, রং মশাল, তুবড়ি, চরকি থেকে শুরু করে কালীপটকা, তালপটকা, চকোলেট বোম সব মজুত করে বাড়ি ফিরলে মা এর বকুনি থেকে বাঁচানোর জন্যেও সেই ছোটমামা।

পরের দিন কালীপুজোয় আমাদের সকাল থেকে তুমুল ব্যস্ততা। প্রথমত, সব বাজি রোদে দেওয়া, দ্বিতীয়ত, দেওয়ালী ঘর তৈরি করা। আজকাল রেডিমেড দেওয়ালী ঘরও কিনতে পাওয়া যায়, কিন্তু তার আনন্দ আমাদের ভাইবোনে মিলে অপটু হাতে তৈরি ইট, মাটির দেওয়ালী ঘরের সাথে পাল্লা দিতে পারবেনা কোনও অংশে। দীপাবলীর সন্ধ্যে নামার সাথে সাথে আমাদের চারপাশ যখন প্রদীপমালায় সেজে উঠত, আমাদের নিজের তৈরি দেওয়ালী ঘরটা যখন ফুল আর প্রদীপের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠত, তা যে আজকালকার ফ্যান্সি টুনি লাইট কে হার মানাত সেটা নিশ্চিত।

আমি তখনও ফুলঝুরি আর রংমশালে আটকে আছি, দাদা তুবড়ি, চরকি ছাড়িয়ে বোম ফাটানোয় হাত পাকিয়েছে বেশ। তারপর যখন আমিও একটু উচ্চতায় বাড়লাম, তখন আমিও বোম ফাটানোর তীব্র ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখতে পারলাম না আর। এদিকে মনে তখনও ভয় ষোলোআনা, কারণ তার আগের বছরই আমার স্কুলের এক বান্ধবীর হাতে চকোলেট বোম ফেটে হাত পুড়ে যাওয়ার ঘটনার স্মৃতি মনে টাটকা। অগত্যা উপায়? আবার সেই সব বিপদে পরিত্রাতা, ‘ছোটমামা’। বাঁশের কঞ্চির আগায় বোম আটকে সেটা দূর থেকে প্রদীপের আগুনে লাগিয়ে ফাটানো, সে এক অভিনব মজাদার দৃশ্য।  তারপর বাজি পর্ব শেষ হলে জমিয়ে লুচি মাংস খেয়ে সদলবলে সারারাত জেগে ঠাকুর দেখা। তখন তো আর এখনের মত আলাদা করে ‘নাইট লাইফ’ এর বালাই ছিলনা, বছরে ঐ একদিন সারারাত ঠাকুর দেখার রোমাঞ্চকর অনুভূতি তাই ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।

আস্তে আস্তে সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু পরিবর্তন হল। দিদা নেই আজ অনেক বছর। আমি, দাদা পড়াশোনা নিয়ে বাইরে চলে গেলাম, বাকি মামাতো, মাসতুতো বোনেরাও এখন অনেক বড়ো। আমাদের কালীপুজো, ভাইফোঁটাগুলো এখন বেশিরভাগ ভিডিও কলেই কেটে যায়। আজ রংবেরংয়ের চীনা আলোর সম্ভার ‘সুয়োরানী’ হয়ে প্রদীপের ম্লান আলো ঠাঁই পেয়েছে ‘দুয়োরানী’র ঘরে। ডিবরি আর দেখাই যায়না। সঙ্গত কারণেই বাজি ব্যবহারে আজ নিষেধাজ্ঞা। প্রদীপ বা মোমের নরম আলোর ছোঁয়াটা এখন মূলত বাহারি ফটোশুটের একটা অনুষঙ্গ মাত্র। আমরা নিজেরাই বদলে গেছি আসলে, তাই আমরাও দিওয়ালীতে ‘সেলিব্রেশনস’ এর নামে সেন্টেড ক্যান্ডেলস আর ফেয়ারী লাইটের খোঁজটাই আগে করি। তবে বছরের এই সময়টায় একটু হলেও সেই ছোটবেলাটাকে মিস করি। এইবার বেশ অনেকগুলো বছর পরে আমরা সব ভাইবোনেরা কালীপুজোয় আবার এক জায়গায়, নেপথ্যে কোভিড আর লকডাউন, আমাদের জন্যে শাপে বর হয়েছে। এবার আমরা আবার দেওয়ালী ঘর বানাবো ঠিক করেছি, নিজেদের হাতে। আমার মা বাবা বলে আমাদের প্রজন্মটা নাকি জীবনের আসল পাওয়া গুলোর অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছি যান্ত্রিকতার ভিড়ে। আমি বলি আমরা যা পেয়েছি আমাদের পরের প্রজন্ম হয়তো তাও পাবেনা। আমার আড়াই বছরের ভাইপো হয়তো ভবিষ্যতে এইসব দেওয়ালী ঘর, ডিবরি, চোদ্দ শাক কিছুই জানবেনা। ওর বাবা, পিসিরা নাহয় তাদের ছোটবেলার একটা অংশ ওকে প্রত্যক্ষ করাক। বাকি ভবিষ্যতে নিজের শিকড় ও নিশ্চয়ই নিজেই খুঁজে নিতে পারবে।

ছবি: গুগল

Facebook Comments Box
Shreosi Ghosh

A whole time doctor, ameture writer, part time food photographer and dancer... Basically I'm jack of all trades, master of none?

Recent Posts

SVF Music Unveils April Edition of “Banglar Gaan Indies”

Following the resounding success of the inaugural edition, SVF Musicproudly announces the arrival of the…

1 week ago

Mimi Chakraborty and Nabila to Star Alongside Shakib Khan in ‘Toofan’

Amidst ongoing speculations regarding the leading lady opposite Shakib Khan in the upcoming film 'Toofan',…

1 month ago

Why Does a Rich Chicago Law Firm Keep Suing Indian Tribes?

This article originally appeared in DC Journal: https://dcjournal.com/why-does-a-rich-chicago-law-firm-keep-suing-indian-tribes/ Why does a deep-pockets Chicago law firm keep…

5 months ago

Anupam Roy’s ‘Aami Sei Manushta Aar Nei’ is a Musical Masterpiece

In a spectacular celebration coinciding with the birthday of the iconic actor Prosenjit Chatterjee, the…

7 months ago

অনুষ্কা পাত্রর কণ্ঠে শোনা যাবে দে দে পাল তুলে দে

হিমেশ রেশামিয়ার পর সুরাশা মেলোডিজ থেকে অনুষ্কা পাত্রর নতুন গান পুজো আসছে মানেই বাঙালির নতুন…

7 months ago

Srijit Mukherji’s Dawshom Awbotaar is On a Roller Coaster!

The highly awaited trailer of grand Puja release, "Dawshom Awbotaar", produced by Jio Studios and…

7 months ago

This website uses cookies.