West Bengal’s Great Electoral Erasure: অনিশ্চয়তায় ৯০ লক্ষ ভোটার!
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির হাওয়ায় এখন গণতান্ত্রিক উৎসবের গন্ধ থাকার কথা ছিল, কিন্তু তার বদলে গ্রাম থেকে শহর— সর্বত্র এখন এক অদ্ভুত নীরব আতঙ্ক।
এই আতঙ্ক কোনো রাজনৈতিক সংঘর্ষের নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার।
২০২৬ সালের ১ লা মার্চ যখন পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা ডেমোগ্রাফিক প্রজেকশন অনুযায়ী ৭.৬ থেকে ৭.৭ কোটিতে পৌঁছানোর কথা, ঠিক তখনই রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা এক অদ্ভুত ‘ম্যাজিক’ দেখাল। ২৮ শে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সেই তালিকায় দেখা গেল মোট ভোটারের সংখ্যা মাত্র ৭.০৪ কোটি। তার মানে, স্রেফ খাতা-কলমে কয়েক মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উধাও হয়ে গেছেন কয়েক লক্ষ মানুষ।
কী করে?
তুমি যদি পরিসংখ্যানে চোখ রাখো, তবে দেখবে এই ধাক্কাটা কতটা জোরালো।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের ‘ইলেক্টর-টু-অ্যাডাল্ট পপুলেশন’ (EP) রেশিও ছিল ৯২.১%। গত কয়েক বছরে সেটা বাড়তে বাড়তে ১০২%-ও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের ভাষায়, এই অতিরিক্ত অংশটুকু ছিল ‘আবর্জনা’ বা জাল ভোটার।
কিন্তু ২০২৬-এর ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR)-এর পর সেই অনুপাত ধপাস করে আছড়ে পড়ল ৯২.৬%-এ। আর যদি আজ ৬-ই এপ্রিলের সুপ্রিম কোর্টের আপডেট মেনে সেই ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিবেচনাধীন থাকা ৬০ লক্ষ মানুষের অর্ধেককেও ছেঁটে ফেলা হয়, তবে এই অনুপাত নেমে দাঁড়াবে ৮৯ শতাংশের নিচে।
অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জন সাবালক বাঙালির মধ্যে অন্তত ১১ জনের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে স্রেফ ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ বা ‘নথির অভাব’-এর অজুহাতে।
এই গণ-ছাঁটাইয়ের পেছনে আসল কারিগর কিন্তু কোনো মানুষ নয়, বরং এক রহস্যময় অ্যালগরিদম। ‘অল্ট নিউজ’-এর সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর সত্য। যে ভোটার তালিকা আগে পিডিএফ আকারে সাধারণ মানুষ ডাউনলোড করতে পারত, তাকে এক দুর্ভেদ্য ডিজিটাল দুর্গে বন্দি করে ফেলা হয়েছে। ক্যাপচা কোডের ঘনঘটার আড়ালে এমন এক ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে কোনো সাধারণ নাগরিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বুঝতেও না পারে যে গণহারে ঠিক কার নাম কাটা যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলছে ‘ক্লিনিং’। কিন্তু কীসের ভিত্তিতে এই ক্লিনিং?

তারা ব্যবহার করেছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা ‘আনম্যাপড ক্যাটেগরি’-র মতো কিছু কঠিন শব্দ। যার সহজ মানে হলো, যদি কোনো ভোটারের নাম বা ঠিকানায় টাইপিংয়ের সামান্য ভুল থাকে, তবে তাকে সরাসরি ‘সন্দেহভাজন’ তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।
ধরো, কারো বাড়ির নম্বর ফর্মে ভুলবশত একরকম ছিল আর সরকারি পোর্টালে অন্যরকম,
ব্যাস! কয়েক দশকের ভোটার হওয়া সত্ত্বেও রাতারাতি সে হয়ে গেল ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর শিকার।
এই সমস্যার মূলে রয়েছে ভোটার ডাটাবেসের ফরম্যাট বদল। ডিজিটাল মাইগ্রেশনের সময় কয়েক লক্ষ মানুষের নামের বানান, বয়স বা ঠিকানার তথ্য এলোমেলো হয়ে গেছে। আর সেই যান্ত্রিক বিচ্যুতিকেই ভোটারদের জালিয়াতি হিসেবে ধরে নিয়েছে কমিশন।
যে মানুষটা হয়তো গত ৪০ বছর ধরে ভোট দিচ্ছেন, তাকে হঠাৎ এক নোটিশে বলা হচ্ছে— “প্রমাণ করো তুমি ভারতের নাগরিক এবং এই ঠিকানায় থাকো।”
তুমি হয়তো ভাবছ, এটা তো শুধু একটা সংখ্যা। কিন্তু আজকের সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে যখন দেখা যায় যে ৫৯ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ মাত্র কয়েক ঘণ্টার শুনানিতে ঠিক করে ফেলা হচ্ছে, তখন বোঝা যায় গণতন্ত্রের এই ফাটলটা কতটা গভীর।
যে ৬০ লক্ষ মানুষের নাম ‘অ্যাডজুডিকেশন’ পুলে আটকে আছে, তাদের মধ্যে অন্তত ৪৫ শতাংশের ডিলিট হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় নিশ্চিত। এর মানে হলো, প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ—যারা এই বাংলার ধুলো-কাদায় বড় হয়েছে—তারা আগামী ২৩ শে এপ্রিল পোলিং বুথে গিয়ে দেখবে তাদের নামটাই আর নেই।
এই পরিসংখ্যান কি শুধুই ভুল সংশোধন, নাকি এক পরিকল্পিত বর্জন?
দীর্ঘ ২-৩ দিন ধরে এই সমস্ত তথ্যের ব্যবচ্ছেদ করার পর যখন দেখছি, তখন দেখা যায় এই ‘৬০ লক্ষ’ সংখ্যাটা কেবল কোনো অংক নয়—এটা হলো এক অমানবিক বিচারপ্রক্রিয়ার খতিয়ান। আজ ৬ ই এপ্রিলের অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সেই ‘অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার যে ফলাফল সামনে আসছে, তা কোনো যুদ্ধের খতিয়ানের চেয়ে কম নয়।
তুমি কি কল্পনা করতে পারো, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৫৯.১৫ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলা সম্ভব? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ৫০০-র বেশি জুডিশিয়াল অফিসার নিয়োগ করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের ওপর যে কাজের চাপ দেওয়া হয়েছিল, তা ন্যায়বিচারের সংজ্ঞাকেই বদলে দিয়েছে।

প্রতিদিন গড়ে ২ লক্ষ করে অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়েছে। যেখানে একজন মানুষের পরিচয় যাচাই করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নথিপত্র দেখার কথা, সেখানে সেকেন্ডের ব্যবধানে কয়েক হাজার মানুষের নাম ‘ডিলিট’ বাটনে টিপে মুছে দেওয়া হয়েছে।
আজকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে অন্তত ৪৫ শতাংশের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ার পথে। এর মানে হলো, কয়েক দশকের ভিটেমাটি, জমির দলিল আর রেশন কার্ড থাকা সত্ত্বেও প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ আজ রাতারাতি ‘অস্তিত্বহীন’ হয়ে গেলেন। তারা এখন আর কেবল ‘ভুল ডাটা’ নন, তারা এখন রাষ্ট্রহীন হওয়ার আতঙ্কে থাকা রক্ত-মাংসের মানুষ।
এই ঝড়ের ঝাপটা থেকে বাদ যাননি দেশের রক্ষকরাও। আমি যদি তোমাকে উইং কমান্ডার (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ শামিম আখতারের কথা বলি—যিনি ১৭ বছর ভারতীয় বিমানবাহিনীতে দেশসেবা করেছেন—তাঁর নামও এই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র অজুহাতে ভোটার তালিকা থেকে উধাও করে দেওয়া হয়েছে।
তাঁর পরিবারের সবার নাম আছে, অথচ বীরত্বের পদক পাওয়া একজন নাগরিককে আজ নিজের ঘরেই পরদেশি হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। এমনকি বিখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুর নাতিও এই ডিজিটাল ঝড়ে নিজের নাম হারিয়েছেন। ভাবো তো, যাঁদের হাতে এই দেশের পরিচয় তৈরি হয়েছে, তাঁদের উত্তরসূরিরাই আজ এই ‘ম্যাপড ইন্ডিভিজুয়াল’ হওয়ার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছেন।

তুমি যদি গ্রামীণ বাংলার দিকে তাকাও, তবে দেখবে এই সংকটের আসল চেহারাটা আরও করুণ। ‘আর্টিকেল-১৪’-এর মতো পোর্টালগুলো যে রিপোর্ট দিচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে সীমান্ত সংলগ্ন জেলা এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় এই ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর হার সবথেকে বেশি।
একজন দিনমজুর তার সারা দিনের রোজগার কামাই করে শুনানিতে হাজিরা দিতে যাচ্ছে। হাতে ধরা তার বাবার পুরোনো হাতচিঠি বা দাদুর আমলের ধুলোমাখা ল্যান্ড রেকর্ড। কিন্তু উল্টোদিকে বসে থাকা অফিসারটি স্রেফ বলছেন, “আপনার ডাটা পোর্টালে মিসম্যাচ দেখাচ্ছে।”
পোর্টালে নামের বানানে একটা ‘A’ কম থাকা বা টাইপিংয়ে একটা সংখ্যা ভুল হওয়াটাই এখন দেশদ্রোহিতার সমান অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মানুষগুলো কোনো বড় উকিল ধরতে পারেন না, তারা ‘অল্ট নিউজ’-এর মতো ডাটা এনালাইসিস বোঝেন না—তারা শুধু বোঝেন যে ২৩ শে এপ্রিল তাদের আঙুলে নীল কালি পড়ার বদলে হয়তো তাদের দরজায় কড়া নাড়বে অন্য কোনো নোটিশ।
২০২৬-এর এই নির্বাচনে ভোট হবে, উৎসব হবে, হয়তো নতুন সরকারও আসবে। কিন্তু সেই জয়ের উল্লাসের নিচে চাপা পড়ে থাকবে ৯০ লক্ষ মানুষের বোবা কান্না। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এর আগে কখনো এত বড় ‘সাইলেন্ট এক্সক্লুশন’ বা নীরব বর্জন দেখা যায়নি।
একদিকে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র জয়গান, অন্যদিকে সেই ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাবেই লক্ষ লক্ষ মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া—এই বৈপরীত্যই আজকের বাংলার ধ্রুব সত্য।
আজকের রাতটা পশ্চিমবঙ্গের কয়েক লক্ষ পরিবারের জন্য নির্ঘুম। কারণ কাল সকালে যখন তারা বুথ লেভেল অফিসারের কাছে যাবে, হয়তো শুনবে যে তাদের কয়েক প্রজন্মের ইতিহাস স্রেফ একটা ‘সফটওয়্যার বাগ’-এর কারণে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এই যে ৯০ লক্ষ মানুষ ফ্র্যাঞ্চাইজি নেটের বাইরে চলে গেলেন, একে কি আমরা সত্যিই ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ বলতে পারি?
উত্তরটা সময়ের কাছেই তোলা থাকল।