১২৭০ কোটি টাকার পারিবারিক কন্ট্রাক্টে! CM Pema Khandu

১২৭০ কোটি টাকার কন্ট্রাক্টে দেওয়া হয়েছে CM Pema Khandu -র পরিবারকেই?

ভারতের উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি রাজ্য অরুণাচল প্রদেশ—নিরিবিলি, সুন্দর, কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে সাম্প্রতিক সময়ে এক গভীর বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশ সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

অভিযোগ, প্রায় ১,২৭০ কোটি টাকার সরকারি কন্ট্রাক্ট এমন কিছু সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে, যাদের সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের যোগ থাকতে পারে। আর সেই কারণেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত এখন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI-কে প্রাথমিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে।

Arunachal Pradesh CM Pema Khandu

তুমি যদি এই ঘটনাকে শুধুই একটি “দুর্নীতির অভিযোগ” হিসেবে দেখো, তাহলে হয়তো পুরো ছবিটা বোঝা যাবে না। কারণ এই গল্পের ভেতরে আছে ক্ষমতার রাজনীতি, দলবদলের ইতিহাস, আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জটিলতা—সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক কাহিনি।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, CBI-কে প্রথমে একটি “প্রাথমিক তদন্ত” করতে হবে। অর্থাৎ, এখনই কাউকে দোষী বলা হচ্ছে না, বরং দেখা হচ্ছে অভিযোগগুলোর ভিত্তি আছে কিনা। এই তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে—কীভাবে কন্ট্রাক্টগুলো দেওয়া হয়েছিল, টেন্ডার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, এবং সেই সংস্থাগুলোর সঙ্গে আসলেই কোনো স্বজনপ্রীতির সম্পর্ক আছে কিনা।

অভিযোগগুলো নতুন নয়। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক গোষ্ঠী এই বিষয়টি তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ সরকারি প্রকল্প এমন কিছু কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে, যাদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ মুখ্যমন্ত্রীর আত্মীয়দের হাতে থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, অভিযোগ উঠেছে—কিছু ক্ষেত্রে টেন্ডার প্রক্রিয়া হয়তো ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়নি, বা প্রতিযোগিতা সীমিত রাখা হয়েছিল।

এই অভিযোগগুলো আদালতে পৌঁছায় একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) মাধ্যমে। মামলাকারীরা আদালতকে বলেন, বিষয়টি এতটাই গুরুতর যে রাজ্য বা স্থানীয় তদন্তে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। তাই একটি স্বাধীন সংস্থা—CBI—এর মাধ্যমে তদন্ত প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্ট সেই যুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে এই নির্দেশ দেয়।

কিন্তু এখানেই গল্প থেমে যায় না। এই অভিযোগের পেছনে যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, সেটাও বুঝতে হবে। কারণ অরুণাচল প্রদেশের রাজনীতি গত এক দশকে এমনভাবে বদলেছে, যা গোটা দেশের মধ্যেই বিরল।

বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু প্রথমে কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু সেই একই বছরেই হঠাৎ করে রাজ্যের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন ঘটে। একসঙ্গে বহু বিধায়ক কংগ্রেস ছেড়ে একটি আঞ্চলিক দল—পিপলস পার্টি অফ অরুণাচল (PPA)-এ যোগ দেন। খাণ্ডুও সেই দলে চলে যান।

এর কিছুদিনের মধ্যেই আবার এক বড় মোড়। সেই একই বিধায়করা, সহ মুখ্যমন্ত্রী, বিজেপিতে যোগ দেন। কয়েক মাসের মধ্যে পুরো সরকার কার্যত কংগ্রেস থেকে বিজেপির দিকে সরে যায়। এই ধরণের দ্রুত ও ব্যাপক দলবদল ভারতীয় রাজনীতিতে খুব একটা দেখা যায় না।

তুমি যদি ভাবো, এখানেই সব শেষ—তাহলে ভুল করবে। এর পরের বছরগুলোতেও অরুণাচলে দলবদল চলতেই থাকে। ২০২০ সালে জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর ছয়জন বিধায়ক একসঙ্গে বিজেপিতে যোগ দেন। ধীরে ধীরে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ৬০ সদস্যের বিধানসভায় বিজেপি একাই প্রায় ৪৫ টির বেশি আসনে প্রভাব বিস্তার করে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটা শুধু সংখ্যার খেলা নয়—এটা দেখায় কীভাবে একটি রাজ্যে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলে যেতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই উঠে আসে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কন্ট্রাক্ট, এবং ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন।

অভিযোগকারীদের মতে, যখন একটি দল বা গোষ্ঠী এতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন স্বচ্ছতা বজায় রাখা আরও জরুরি হয়ে যায়। কারণ বিরোধী শক্তি দুর্বল হলে, প্রশ্ন তোলার জায়গাও কমে যায়। আর ঠিক সেই জায়গাতেই এই কন্ট্রাক্ট বিতর্ক নতুন করে গুরুত্ব পায়।

তবে এখানে একটা বিষয় পরিস্কার করে বলা জরুরি—এখনো পর্যন্ত কোনো আদালত পেমা খাণ্ডু বা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করেনি। সবকিছুই এখনো “অভিযোগ” এবং “তদন্তাধীন” পর্যায়ে রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও একটি প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য, চূড়ান্ত রায় নয়।

এই অবস্থায় প্রশ্নটা দাঁড়ায়—এই তদন্ত কী দেখাবে? অভিযোগগুলো কতটা সত্যি, আর কতটা রাজনৈতিক? প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আড়ালে কি সত্যিই কোনো স্বজনপ্রীতি লুকিয়ে আছে, নাকি এটা শুধুই একটি রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এখন নজর CBI-র দিকে।
সেই CBI হুমম!

আরেকটু ভিতরে গিয়ে দেখা যাক বিষয়টা।

২০১৬ সাল। অরুণাচল প্রদেশের রাজনীতি তখন তুমুল অস্থির। সেই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম—কালিখো পুল। তিনি কিছু সময়ের জন্য মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু সেই বছরই তাঁর মৃত্যু ঘিরে এক বড় বিতর্ক তৈরি হয়। তাঁর রেখে যাওয়া একটি নোটে একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছিল। সেই তালিকায় পেমা খাণ্ডুর নামও উঠে আসে।

Ex CM Late Kalikho Pul with PM Narendra Modi

এই নোট নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হয়েছিল। অনেকেই দাবি করেছিলেন, এই অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। আবার অন্যপক্ষ বলেছিল, একটি ব্যক্তিগত নোটকে সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি জটিল ছিল, এবং শেষ পর্যন্ত এই অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

তুমি এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারো—অরুণাচলের রাজনীতিতে অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু প্রমাণের প্রশ্ন সবসময়ই থেকে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই সামনে আসে আরেকটি অভিযোগ—যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে কিনা। কিছু জনস্বার্থ মামলায় দাবি করা হয়েছে, কিছু অ্যাক্টিভিস্ট বা সামাজিক কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এমনকি কঠোর ধারায় মামলা দায়েরের অভিযোগও উঠেছে।

এই দাবিগুলো কতটা সত্যি, সেটা এখনও বিচারাধীন বিষয়। কিন্তু এই অভিযোগগুলো একটা বড় প্রশ্ন তোলে—একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনার জায়গা কতটা নিরাপদ?

তুমি যদি এই পুরো বিষয়টাকে একটু দূর থেকে দেখো, তাহলে একটা দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আইন বনাম রাজনীতি।

একদিকে সুপ্রিম কোর্ট বলছে, অভিযোগগুলো এতটাই গুরুতর যে একটি স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে, শাসকপক্ষের তরফে বারবার বলা হয়েছে—এই অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন, এবং রাজনৈতিক ভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এই টানাপোড়েনটাই আসলে ভারতের গণতন্ত্রের একটি বড় বাস্তবতা। আদালত, প্রশাসন এবং রাজনীতি—এই তিনটি স্তরের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সবসময়ই সহজ নয়।

অরুণাচলের ক্ষেত্রেও সেটাই দেখা যাচ্ছে। একদিকে দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন, দলবদল, এবং শক্তিশালী সরকার; অন্যদিকে সেই শক্তির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন।

Arunachal Pradesh Local People

এখানে আরেকটা দিকও গুরুত্বপূর্ণ—এই রাজ্যের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। অরুণাচল একটি ছোট রাজ্য, যেখানে বিধানসভার আসন মাত্র ৬০টি। ফলে কয়েকজন বিধায়ক দল বদল করলেই ক্ষমতার সমীকরণ পুরো বদলে যেতে পারে। আর এই কারণেই এখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেক সময় ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।

এই ভঙ্গুরতার মধ্যেই যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা আরও বড় আকার নেয়। কারণ তখন বিষয়টা শুধু একটি কন্ট্রাক্ট বা একটি প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—এটা হয়ে ওঠে শাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

তবে আবারও মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি—এখনো পর্যন্ত কোনো আদালত এই অভিযোগগুলো প্রমাণ করেনি। সুপ্রিম কোর্ট শুধু বলেছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। CBI-র তদন্তই এখন নির্ধারণ করবে—এই অভিযোগগুলোর ভিত কতটা শক্ত।

Supreme Court Of India

তুমি হয়তো ভাবছো—এই ধরণের ঘটনা কি শুধু অরুণাচলেই ঘটে?
আসলে না।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দলবদল, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, এবং দুর্নীতির অভিযোগ—এই তিনটি বিষয় প্রায়ই একসঙ্গে জড়িয়ে যায়। কিন্তু অরুণাচলের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের গতি এবং মাত্রা অনেকটাই আলাদা।

এক দশকের মধ্যে একটি রাজ্যের রাজনৈতিক চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া, এবং সেই সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠা—এই দুটো বিষয় মিলেই এই ঘটনাকে বিশেষ করে তোলে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ, কিন্তু উত্তরটা জটিল—জনগণের টাকার ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ?

একদিকে পাহাড়ি এই রাজ্যের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ সরকারি বিনিয়োগ। রাস্তা, সেতু, অবকাঠামো—সবকিছুই জরুরি। কিন্তু সেই বিনিয়োগ যদি বিতর্কের ছায়ায় ঢেকে যায়, তাহলে উন্নয়ন আর প্রশ্নের মধ্যে সীমারেখাটা ঝাপসা হয়ে যায়।

এখন সব নজর এক জায়গায়—CBI-র তদন্ত। তারা কী খুঁজে পায়, কী প্রমাণ সামনে আনে, আর শেষ পর্যন্ত এই অভিযোগগুলো কতটা সত্যি বা মিথ্যা প্রমাণিত হয়—সেটাই নির্ধারণ করবে এই গল্পের পরবর্তী অধ্যায়।

ততদিন পর্যন্ত, অরুণাচল প্রদেশ রয়ে যাবে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে—
ক্ষমতা কি শুধু সংখ্যার খেলা, নাকি তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জবাবদিহিতার দায়ও?

Facebook Comments Box

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *