কলকাতা, ৬ এপ্রিল ২০২৬: India’s Education Reset
ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত বিতর্কিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা হয়তো এমন এক ‘গ্রেট রিসেট’-এর সাক্ষী হতে চলেছি, যা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। সাম্প্রতিক রিপোর্ট এবং সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান সামনে আসছে—দেশজুড়ে প্রায় ২০ লক্ষ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বছরের পর বছর শিক্ষকতা করার পরেও এখন তাদের দিতে হবে ‘যোগ্যতা নির্ধারণকারী পরীক্ষা’ (Competency Exam)। আর যারা এই অগ্নিপরীক্ষায় পাশ করতে পারবেন না, তাদের জন্য দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, National Education Policy (NEP)-এর লক্ষ্য হলো ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করে তোলা। কিন্তু এই ‘বিশ্বমান’ অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে সেই শিক্ষকদের, যারা ২০১১ সালের আগে (RTE আইন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগে) চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। সরকারের যুক্তি—শ্রেণীকক্ষে গুণগত মান ফেরাতে গেলে শিক্ষকদের আধুনিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে।
কিন্তু প্রশ্নটা হলো টাইমিং নিয়ে।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন এই ২০ লক্ষ শিক্ষকের অনেকেরই বয়স ৪৫ থেকে ৫৫-র কোঠায়, তখন তাদের ওপর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কি মানবিক?

বিভিন্ন গ্রাউন্ড রিপোর্ট থেকে বোঝা যাচ্ছে যে অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষক যারা ২০ বছর ধরে সফলভাবে স্কুল চালিয়েছেন, তারা আজ এই নতুন ডিজিটাল এবং কম্পিটেন্সি-বেজড পরীক্ষার ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন।
এটি কি শুধুই মানোন্নয়ন, না কি আদতে পুরনো কাঠামোর বিপুল সংখ্যক কর্মীকে সরিয়ে দেওয়ার এক সুক্ষ্ম কৌশল?
এই সংকটের মূলে রয়েছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আসা সুপ্রিম কোর্টের সেই ঐতিহাসিক রায়। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, শিক্ষার অধিকার আইনের (RTE) আওতায় প্রতিটি শিক্ষককে TET (Teacher Eligibility Test) পাশ করতেই হবে। এর পরেই পরিস্থিতি জটিল হতে শুরু করে। বর্তমান সময়রেখা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ লা সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই ২০ লক্ষ শিক্ষককে অন্তত একবার পরীক্ষায় বসে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।

২০২৬-এর এই এপ্রিল মাসে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, দিল্লি থেকে কলকাতা—প্রতিটি রাজ্যের শিক্ষক সংগঠনগুলো এখন রাজপথে। তাদের একটাই দাবি, “অভিজ্ঞতার কি কোনও দাম নেই?”
একজন শিক্ষক যিনি কয়েক প্রজন্মকে মানুষ করেছেন, তাকে কি একটি ২ ঘণ্টার ‘মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেন’ দিয়ে বিচার করা সম্ভব?
অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত আসলে ভারতের শ্রমবাজারে এক বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত—যেখানে ‘পার্মানেন্ট জব’ বলে আর কিছু থাকছে না; সবকিছুই হয়ে যাচ্ছে ‘পারফরম্যান্স-বেজড’।
পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু এবং কেরালার মতো রাজ্যগুলোতে এই ইস্যুটি এখন রাজনৈতিক দাবানলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে আগে থেকেই হাজারো বিতর্ক, সেখানে এই নতুন ‘যোগ্যতা পরীক্ষা’ মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।
অনেক রাজ্য সরকার কেন্দ্রের এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সরব হলেও, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকায় তারা আইনিভাবে কোণঠাসা।
ফলস্বরূপ, রাজ্যগুলো এখন ‘স্পেশাল টিইটি’ (Special TET) বা রিফ্রেশার কোর্সের আয়োজন করছে। কিন্তু সমস্যা হলো সিলেবাস নিয়ে। ৫০ বছর বয়সী একজন শিক্ষককে যদি আজ আধুনিক পেডাগোজি (Pedagogy) বা ডিজিটাল লজিক নিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়, তবে তার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশেরও বেশি। আর এই ব্যর্থতাই ডেকে আনবে ‘কম্পালসরি রিটায়ারমেন্ট’ বা বাধ্যতামূলক অবসর।

এই ‘রিসেট’-এর পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষার বেসরকারিকরণ। অভিজ্ঞদের মতে, সরকারি স্কুলগুলোতে যখন যোগ্যতার দোহাই দিয়ে শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তখন সমান্তরালভাবে এডটেক (EdTech) সংস্থাগুলো এবং বড় বড় বেসরকারি চেইন স্কুলগুলো ডালপালা মেলছে। ২০ লক্ষ শিক্ষক যদি এই সিস্টেম থেকে বেরিয়ে যান বা যেতে বাধ্য হন, তবে সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে কারা? নতুন প্রজন্মের চুক্তিনির্ভর শিক্ষকরা, যারা হয়তো অনেক কম বেতনে এবং কোনও পেনশন ছাড়াই কাজ করতে রাজি হবেন।
এখানেই লুকিয়ে আছে ‘কর্পোরেট স্টাইল’ ম্যানেজমেন্টের ছোঁয়া। ভারতের প্রতিটি সেক্টর—তা সে অগ্নিপথের মাধ্যমে সেনাবাহিনী হোক বা ব্যাঙ্কিং সেক্টর—সব জায়গাতেই এখন ‘শর্ট-টার্ম’ এবং ‘পারফরম্যান্স-লিঙ্কড’ মডেল আনা হচ্ছে। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এই একই মডেল প্রয়োগ করা হচ্ছে, যেখানে আপনার চাকরি টিকে থাকবে আপনার স্কোর কার্ডের ওপর ভিত্তি করে, আপনার অভিজ্ঞতার ওপর নয়।
যদি সত্যিই ২০২৭ সালের মধ্যে এই ২০ লক্ষ শিক্ষকের একাংশকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে ভারতের গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক গ্রামে এই প্রবীণ শিক্ষকরাই হলেন শিক্ষার একমাত্র স্তম্ভ। তাদের হঠাৎ সরিয়ে দিলে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা নতুন প্রজন্মের শিক্ষকরা রাতারাতি পূরণ করতে পারবেন না।
বর্তমানে আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে ডিগ্রির চেয়ে ‘স্কিল’ বা দক্ষতার দোহাই দেওয়া হচ্ছে বেশি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, একজন শিক্ষক কি শুধুই তথ্য সরবরাহকারী মেশিন, নাকি তিনি একজন মেন্টর? ২০২৬-এর এই ‘রিসেট’ হয়তো ভারতের খাতা-কলমে শিক্ষার মান বাড়িয়ে দেবে, কিন্তু হাজার হাজার অভিজ্ঞ শিক্ষকের চোখের জল আর অনিশ্চয়তা এই সংস্কারের গায়ে এক কালো দাগ হয়ে থেকে যাবে।

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন আইনি জটিলতা এবং নীতিগত পরিবর্তনের এক গোলকধাঁধায় বন্দি। ২০ লক্ষ শিক্ষকের ভবিষ্যৎ আজ শুধুমাত্র একটি কলমের খোঁচায় বা একটি পরীক্ষার ফলাফলে আটকে আছে। সরকার যদি এই অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জন্য কোনও ‘ব্রিজ কোর্স’ বা বিকল্প ব্যবস্থার কথা না ভাবে, তবে এই ‘রিসেট’ আসলে একটি ‘ম্যাসিক এক্সিট’ বা গণ-বিতারন হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।
আগামী কয়েক মাস ভারতের প্রতিটি স্কুলের স্টাফ রুমে কান পাতলে একটিই শব্দ শোনা যাবে—
‘অনিশ্চয়তা’।
এই লড়াই এখন আর শুধু বেতন বা পেনশনের নয়, এই লড়াই অস্তিত্বের।
আর এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে—যান্ত্রিক যোগ্যতার না কি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার—তা বলে দেবে ২০২৭-এর সেই ক্যালেন্ডারের পাতা।