fbpx

পোষ্য কে কোনোদিন এমন ভালোবেসেছ, যার জন্যে রাতে উঠে কাঁদ?

পোষ্য কে কোনোদিন এমন ভালোবেসেছ যার জন্য রাতে উঠে কাঁদ? আমি বেসেছি।

ছোটোবেলা থেকেই পোষ্য পাবার খুব শখ ছিল। সেই কোন ছোটবেলায় বাবা একটা টিয়া পাখি কিনে দিয়েছিল। তাকে রোজ খাওয়ানোর দায়িত্ব আমার ছিল।

মনে পড়ে, সেই আমার প্রথম পোষ্য ছিল। তাকে রোজ দুবেলা যত্ন করতাম। কিন্তু কেমন করে জানি না তার হঠাৎ ভীষণ ঠান্ডা লেগে গেল। সকালে খাবার দিতে গিয়ে বুঝলাম, তারপর ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে যেতে… সব শেষ।

মনে পড়ে, আমার জীবনের প্রথম পোষ্য মারা যাবার শোকে অনেক কেঁদেছিলাম। অনেকটাই।

একসপ্তাহ পর বাবা আবার একটা নতুন পোষ্য এনে দিল, সেই টিয়া পাখি। যদিও মনে কষ্ট ছিল তাও নতুন পোষ্যকে দেখে বেশ উৎসাহিত হয়েছিলাম।

আমাদের বাড়ি তখনও পাকা হয়নি। আমার প্রিয় পোষ্য কে তখন ঝুলিয়ে রাখা হত। খাঁচার ভিতর দিয়ে আঙটা লাগিয়ে উপরের দেওয়াল থেকে ঝুলন্ত দড়ি তে ঝুলিয়ে রাখতাম।

যথারীতি এই পোষ্য কেও দেখভাল করার দায়িত্ব আমার উপরেই পড়ে। এরকমই একদিন সকালে খাবার দিতে গিয়ে দেখি, পোষ্য টি আর বেঁচে নেই।

কোমরের তলার অংশটা কে যেন খুবলে খেয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম গতকাল রাতে নাকি ভাম এসেছিল। পোষ্যটির ডানার আওয়াজ অনেকে শুনেছে।

আবার চোখের জলে ভাসলাম আমি। পোষ্য তো গেলই, পরীক্ষার সময়ে আমার পড়াশোনাও শিকেয়। বাবা মা অনেক বোঝানোর পর পরীক্ষা দিই।

তবে সেদিন থেকে কানমুলে শপথ নিয়ে ছিলাম আর যাই করি পোষ্য কোনওদিন পুষব না।

পুচি। আমার বিড়াল। একে আমরা ঠিক পুষিনি। এ আমাদের আপনা আপনি পোষ্য হয়ে গেছিল।

এর দিদা, ভোলা, সে এসে প্রথমে থাকতে শুরু করেছিল এ বাড়িতে। আমরা অত পাত্তা দিইনি তখনও অবধি। তারপর এর মা সুন্দরী এল। তখনও অত পাত্তা দিইনি আমরা। এমনিতেই পোষ্য পুষতে নারাজ আমি, তাই অত মন লাগাইনি।

এই পোষ্যটি যে কীভাবে আমার সাথে এতটা একাত্ম হল তা এখনও বুঝতে পারছি না।

সুন্দরীর বাকি বাচ্চাগুলোকে বাইরে ছেড়ে দিয়ে আসলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে পুচি ফিরে আসে থাকতে।
একে তো ছোটো শরীর তার উপর বড় বড় চোখ দুটো, সবসময় যেন বেবাক কৌতূহল হয়ে সে সব দেখছে।

পোষ্য অনেক পড়ে সে হয়। আগে সে তার ছোট্ট শরীর নিয়ে আমাদের আগুপিছু ঘুরত। অথচ ধরতে গেলেই ভয়ে পালাত।

ক্রমে ভয় কেটে গেল। কাছে আসত, চটকাতাম আমরা তাও কিছু বলত না। পোষ্য যে এত মানুষের কথা শোনে তা জানতাম না, তাও বিড়াল। মনে পড়ে মেজমার ছেলেমেয়েকে বলতাম, ” ওরে তোদের এবার মেজমা ফেলে দেবে দেখিস। পুচি কে ছেলে করবে “। মেজমা হাসতে হাসতে বলত, ” সত্যিই তাই। ওরা কেউ কথা শোনে না। পুচি তবু কথা শোনে” ।

পোষ্যটির নামের অনেক বিভেদ ছিল। আমি ডাকতাম পুচি বলে, আর মেজমা ডাকত বুল্টি বলে, পীতু ডাকত নুসিপুলু বলে। অবাক বিষয় এই যে পোষ্যটি সব ডাকেই ম্যাও বলে সাড়া দিয়ে আহ্বানকারীর কাছে ছুটে চলে যেত।

রোজ সকালে উঠে দেখতাম ঘুমোচ্ছে। বেলা বারোটায় উঠে কিছু খেয়ে আবার দেখতাম ঘুমোচ্ছে। সন্ধ্যা বেলায় দেখতাম ঘুমোচ্ছে। পোষ্য রাতে বিচরণ করত। তবে ঠিক আমি শোবার আগেই দেখতাম ও চেয়ারে ঘুমোচ্ছে। সস্নেহে ওর গায়ে গরম কিছু চাপা দিতাম যাতে মশা না বসে আর ঠান্ডা না লাগে।

খাবার অভ্যাস ছিল বাচ্চাদের মত। সবসময়ই ম্যাও ম্যাও করত। আর চিপস্ এর প্যাকেট খুললে জাস্ট ঝাঁপিয়ে পড়ত। মুড়ি খেত, আইসক্রিম খেত। মনে পড়ে পোষ্যের জন্য বিয়েবাড়ী থেকে কত আইসক্রিম আনতাম।

আর পুচি প্রচুর পোষ মেনেছিল আমাদের। গায়ের রঙ ছিল গোল্ডেন, সচরাচর এরকম দেখা যায় না। ও যেন মানুষ, ওকে কোনো কথা বললে মন দিয়ে শুনত। পোষ্য পোষ মেনেছিল ভালোই। আমার বা পীতুর বাড়ি ফিরতে দেরি হলে গেটের কাছে বসে থাকত।

পোষ্যের মুখখানা ছিল পীতুর মত। নাকখানা ছিল আমার মত। মুখখানা এত ছোটো ছিল যে মাউসের মত একহাতে চলে আসে।

অনেক স্মৃতি জড়ানো আছে ওর সাথে। আজ ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে খবর পেলাম পুচি নেই। পোষ্য মারা গেছে, সম্ভবত ডায়রিয়া রোগে।

পোষ্য। শীতের রাতে ওকে আর ঘরে ঢোকাতে পারব না। সস্নেহে আর ওকে রাতের বেলায় গায়ে চাপা দিতে পারব না। ওর রোগা শরীর আর নিজের কোলে ওঠাতে পারব না। ওর ম্যাও ম্যাও এবং আলসেপনা আর চোখে দেখতে পারব না।

সোনা বললে কেউ সাড়া দেবে না, পুচি বললেও না। তবু চাই যেখানেই থাকবি ভালো থাকবি।

Leave a Reply