Special Story

বন্ধ্যাত্ব যখন আশীর্বাদ

আমি মনে করি , আজকে যে পৃথিবীতে আমরা দাড়িয়ে আছি , সেখানে বন্ধ্যাত্ব একটা মস্ত বড় আশীর্বাদ । বন্ধ্যাত্ব , যার ফলে ছেলেমেয়ে , সন্তান সন্ততির জন্ম দেওয়া সম্ভব নয়। আর এই একটি অসম্ভব , আরেকটি সমস্যার সম্ভব সমাধানের চাবিকাঠি । এই উক্তির পেছনে আমি নিজের মত করে দুখানা যুক্তি দাঁড় করেছি ।

(এক) প্রথম যুক্তিটি মহৎ । ভারত-পাকিস্তান বা চীনের মত দেশে জনসংখ্যার হাল সকলের জানা । আর এই বিপুল জনসংখ্যার একটা বৃহৎ অংশ প্রতিদিন পেট পুরে খেতে পায়না , বস্ত্র ও বাসস্থান তাদের কাছে বিলাসিতা । সেখান থেকে বন্ধ্যাত্বই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সবথেকে সহজ এবং প্রাকৃতিক পথ । যারা মা হওয়ার স্বাদ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ইনফারটিলিটি ক্লিনিকে লাখ লাখ টাকা ঢালছেন । তারা অনাথ আশ্রম থেকে একটা শিশু দত্তক নিয়ে দেখুন না । মনে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি পাবেন । পৃথিবীতে নতুন একটা চোখ খোলার বদলে একটা চোখের জল মুছিয়ে দেখুন ভাল লাগবে ।

(দুই) এবার যে যুক্তিটি দেব , সেটি স্বার্থসর্বস্ব । এই যুক্তিটির অবতারণা করার কারণ হল , মানুষ বিশ্ব সমাজের স্বার্থের থেকে নিজের স্বার্থের বিষয়ে বেশি কনসারন্ড । আমি হিসেব করে দেখেছি , আমি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে আমার বাবা মা আমার পেছনে যে পরিমাণ টাকা খরচ করেছে , সেই টাকায় বাবা মার আরামসে একটা ওয়ার্ল্ড ট্যুর হয়ে যেত । এবং সবথেকে বড় কথা কতটা টেনশন ফ্রি জীবন কাটাতে পারত ওরা । এই একই কারণে আমি সন্তান হিসেবে কোনোদিন গর্ব করতে পারি না । আমি নিজের জন্মদিনে নিজে কেন আনন্দ করব , এর কারণ খুঁজে পাইনি কোনোদিন । আমার জন্মদিনটি আমার মায়ের জন্য একটা মেমরেবল ডে । দীর্ঘ ২৮০ দিন প্রচণ্ড গর্ভ যন্ত্রণা সহ্য করে মা আমকে জন্ম দিয়েছে । তাই এই দিনটাতে আমার মাকে শুভেচ্ছা জানানো উচিত , তাঁকে উপহার দেওয়া উচিত । আমাকে কেন ? হ্যাঁ তবে , আমি যদি কোনোদিন খ্যাত হই , সে ওবামা হই বা ওসামা । সেই দিন আমার গুণগান করার জন্য বা নিছক খিস্তি করার জন্য আমার জন্মদিনটিকে বেছে নিতেই পারেন । যাই হোক , টপিকের বাইরে চলে গেছিলাম । না আমি আরেকটি নতুন প্রাণকে কোনোদিন এই পৃথিবীর মুখ দেখাতে চাই না। আমি আমার রোজগার করা টাকায় ভাল বাড়ি বানাব , পরিবারের সবাই মিলে ইউরোপ ট্যুরে যাব , একটার জায়গায় দুটো গাড়ি কিনবো । কিন্তু সন্তানের পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করব না । আমার মত যাদের ছোট্ট বাচ্চা ভাল লাগে , তারা সপ্তাহে একদিন বা প্রতিদিন অনাথ আশ্রমে যান , ওদের সাথে খেলুন , ভালবাসা দিন । দেখবেন আপনার একটি সন্তান আপনাকে যতটা আনন্দ , যতটা ভালবাসা দিতে পারত , তার থেকে হাজারগুণ গভীর থেকে ভালবাসবে ওরা ।

যুক্তি তো গেল । অনেকেই বলবেন (প্রায় প্রত্যেকেই) রক্তের সম্পর্কের সঙ্গে অন্য সম্পর্কগুলিকে মেলান যায়না । কিন্তু যখন ষোল বছরের কিশোর মোবাইল কেনার টাকা না দেওয়ার জন্য নিজের মায়ের পেতে ছুরি মারে । যখন শহুরে আদবকায়দা না জানার অপরাধে , সমাজের সামনে ছেলে মাকে মা বলে পরিচয় দেয়না । যখন সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার পর সন্তান বাবাকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় । যখন হাজারো ছেলে মেয়ে বাবা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পচে মরার জন্য রেখে আসে তখন কোথায় যায় রক্ত , তখন কোথায় মুখ ঢাকে সম্পর্ক ? না আমি বলছি না যে আপনার দত্তক পুত্র আপনাকে দুঃখ দেবে না । আপনি দত্তক পুত্রের জননী হলে আপনার শেষ জীবন সুখের হবে , তাও বলছি না । আসল কথাটা হল , সম্পর্কের কোন গ্যারান্টি দেওয়া যায় না । ভালবাসা তো LIC নয় যে , “ জীবনভর আপকে সাথ ’’ । কিন্তু আপনার সন্তান বেশিরভাগ সময় ভেবে নেয় যে , তাঁকে ভালবেসে যাওয়াটা , তার প্রতি দায়িত্ব পালন করাটা আপনার কর্তব্য । তাই মা বাবার ভালবাসার মূল্যটা সে বেশিরভাগ সময়ই উপলব্ধি করতে পারে না । কিন্তু যাকে আপনি ফুটপাথ থেকে তুলে এনে মাতৃস্নেহে মানুষ করবেন , সে বুঝবে ভালবাসার মানে । সে জানবে যে আপনার ভালবাসার কোন মূল্যই সে এ জীবনে চোকাতে পারবে না । সে তাই আপনাকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালবেসে যাবে জীবনভর ।

আমার চারিদিকে যে হাজার হাজার বন্ধ্যা দম্পতিকে কাঁদতে দেখছি প্রতিমুহূর্তে , এই কথাগুলি যেমন তাদের বলা তেমনি তথাকথিত সক্ষমদেরও বলা । আমার এই উক্তি এবং যুক্তিগুলি আজ অব্দি কেউ মেনে নেয়নি , হয়তো নেবেও না । তবুও বলব । থামব না । যত ইচ্ছে খিস্তি দিন । তৈরি আছি ।

Show More

Tanmoy Das

কুশপুতুলে পুড়বো যেদিন, যেদিন আমার লেখা রাস্তায় পুড়িয়ে ফেলে স্লোগান দেওয়া হবে- সেদিন কবি বলব নিজেকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker