fbpx
Special Story

অশ্রাব্য সাহিত্য

::(১)::

বাড়ির শিক্ষাদিক্ষা, মা ঠাকুমার শেখানো সহবত, দাদুর সাহিত্য-প্রেম,
বারেবারে অন্বেষকে প্রতিবাদের কলম ধরতে বলে। সাহিত্য রচনার নাম করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা শুরু হয়েছে তা আর সহ্য হচ্ছে না তার।
কি যেন ওই নতুন একটা পেজ হয়েছে, দিনরাত তাদের শুধু একটাই কাজ,
সাহিত্য রচনার নামে যতরকমের অশ্রাব্য ভাষা প্রয়োগ সম্ভব, তার সবগুলোর ব্যবহার করে বেশ মুখরোচক কিছু লেখা ছেড়ে দেওয়া।
ব্যাস তাহলেই কেল্লা ফতে, হাজার হাজার শেয়ার আর লাইকের বন্যায় ভেসে যাবে সারাদিন লেখা গুলো,
আর লেখক ভাববেন “কি কৃতিত্ব টাই না করলাম, সমাজ কত্ত বদলে গেলো লেখাটা পড়ে, আহা”
…আবার পরেরদিন উঠে আসবে নতুন টপিক,
আবার নতুন করে নগ্ন করবে তারা “সাহিত্যজননীকে”।
যাই হোক এবার এর একটা বিহিত করা দরকার। এই ভেবে mobile টা হাতে তুলে নিলো অন্বেষ,
যতটা পারবে কড়া ভাষায় জানাবে প্রতিবাদ।

তারপর ফেসবুক খুলে জনৈক পেজের উদ্দেশ্য করে লিখতে শুরু করল,
“আপনাদের যদি সমাজ বদলানোর এতই ইচ্ছা থাকে তবে, নম্র ভাষায় কিছু লিখুন।
সাহিত্যকে আপনারা দায়িত্ব নিয়ে অশ্রাব্য করে তুলছেন কেন?
যে বিষয় গুলো এতদিন ঘরের মা, বোনেদের অন্দরমহল এ ছিলো সেগুলো কি একান্তই বাইরে না আনলেই নয়…”

::(২)::

“আচ্ছা ওই নতুন লেখাটা পড়লি, উফফ কি লিখেছে ছেলেটা, একদম যোগ্য প্রতিবাদ একেই বলে।
পুলিশ প্রশাসন তো কিছু করতে পারল না,
কিন্তু এই লেখাটা পড়ে সত্যিই সবাই জানবে “যামদুনি acid attack” এর মর্মান্তিক নিষ্ঠুরতার কথা।”
…একটানা বলে থামল দেবামিতা।
আগামী মাসেই দেবামিতা আর অন্বেষ facebook এ নিজেদের relationship এর স্টেটাস দিয়েছে।
অনেক কষ্টে কলেজের সবথেকে সুন্দরী মেয়েকে সে পটিয়েছে, সামান্য কারণেই সম্পর্ক ভাঙার কোনো ইচ্ছা নেই তার।
তাই আজকাল ওর কোন কথাতেই চট করে রাগ করেনা অন্বেষ।
কিন্তু এটা কি রকম কথা, যে লেখাটার জন্য সে এত প্রতিবাদ করল, সেটাকেই ও ভালো বলছে।
“আচ্ছা সাহিত্যের নামে কিছু অশ্রাব্য ব্যবহার করলেই বুঝি প্রতিবাদ হয়ে যায়?” একটু রাগ দেখিয়েই কথা গুলো বলল অন্বেষ।
“দেখ বাপু আমি সাধারণ মানুষ, তোর মতো অত সাহিত্য টাহিত্য বুঝিনা, আমার মতে যে লেখা পড়ে মানেটাই বুঝলাম না সেটা আবার লেখা কিসের, তার থেকে অনেক ভালো যদি কোথাও গালাগালি লেখা থাকে, তবুও সেটা পড়ে মানেটা অন্তত বুঝতে পারি।” ..দেবামিতাও অকপট জবাব দিয়ে দিলো।
এরপর আর বিশেষ কথা না বলে অন্বেষ নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিলো।
অন্যদিন দেবার বাড়ির সামনের গলিটা অবধি অন্বেষও সাথে যায়,
চারিদিকের যা অবস্থা রাত ৮ টা বাজলেও একা একা দেবাকে ছাড়ে না সে।
বারবার দেবা মানা করে, ওর মতে চেনা এলাকায় কি আর হবে এমন, তবু অন্বেষ যায়।
কিন্তু আজ প্রথমবারের জন্য একটু বেশিই রাগ হয়েছে অন্বেষের…
“কিরে আজ যাবিনা??” প্রথমবারের জন্য দেবা এরকম বলল, হয়ত ওর ও অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল…
“নিজেই তো রোজ মানা করিস আমাকে যেতে, তাই আজ তুই নিজেই চলে যা ” ..একটু অভিমানের গলা নিয়েই বলল অন্বেষ।
“ওহ, তবে ঠিক আছে,যাচ্ছি, bye”…
যাচ্ছি নয় আসছি বলতে হয়, ঠাকুমার ডায়লগ টা কানে বাজছিল অন্বেষের…কিন্তু কিছু বলল না সে।

::(৩)::

ঘড়িতে ৩:১২, এত রাতেও কিছু তেই ঘুম আসছেনা অন্বেষের।
দেবার সাথে কিছুতেই contact হচ্ছেনা, বাড়ি পৌঁছে একবার phone ও করেনি, নাহ এতটাও রাগ দেখানো উচিৎ হয়নি ওর ওপর,
কে জানে কতটা রেগে গেলো মেয়েটা।
এইসব সাতপাঁচ ভাবছে এমন সময় হঠাৎ notification এল, “বংশদন্ড replied to your comment on কাটাকাটি”।
এরকম হবে খুব ভালো মতই জানত অন্বেষ,
তাড়াতাড়ি “কাটাকাটি” page টা খুলল সে।
page admin বংশদন্ড তার কমেন্টে উত্তর দিয়ে লিখেছে,
“আপনার মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ।”
ব্যাস, এতটুকুই… নাহ আরো কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানানো উচিত ছিল, মনে মনে ভাবতে বসল অন্বেষ।
আস্তে আস্তে ঘুম নেমে এল চোখে।

::(৪)::

…”ওরা আর সমাজে ওর মুখ দেখানোর অবস্থা রাখেনি।
যমে মানুষের লড়াইয়ের থেকে বাঁচিয়ে ওকে ঘরে আনতে পেরেছি এই যা, পুলিশ কিছু করতে পারল না,
সবাই শুধু করুণা দেখিয়ে চলে যাচ্ছে, আমার মেয়েটা আজ বেঁচেও যেন মরে আছে বাবা!
তুমি ওর সাথে কথা বল বাবা, ওকে বোঝাও একটু…”
অসহায় কাকুর মুখটা দেখে না করতে পারলনা অন্বেষ।
আত্মগ্লানিতে দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে নিজেকে ঘরবন্দি করেছে সে।
দিদি তোমার বন্ধু এসেছে.. “এবার কে এলি রে, সবাই তো ঘুরে দেখে গেছে এই কলেজ সুন্দরির acid পোড়া মুখটা, তা ফলমূল আনিসনি কিছু অন্যদের মত..?
যাই হোক, নে শুরু কর করুণা দেখানো…
“দেবা আমি এসেছি”… চোখ ভরা জল নিয়ে বলল অন্বেষ।
কালো কাপড় ঢাকা মুখটা এইবার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল… “সেদিন রাতে ফেরার সময়, প্রায় বাড়ির কাছেই একটা সাইকেলে, খুব ভুল না করলে ওটা ওই প্রসূনই ছিল, তুই আমাকে propose করার আগে আমি যে ছেলেটাকে reject করেছিলাম সেই প্রসূন”…
“পুলিশ কে বলেছিলিস?”
কথাটা পুরোপুরি শেষ করল না অন্বেষ,
দেবা বলে উঠল…
“লাভ নেই ওর বাবা যে… কিন্তু তুই পারিস না আমার জন্য একটু প্রতিবাদ জানাতে!”
“আমি…??”
“কেন তোর নাকি কলমের খুব ধার, পারিসনা তা দিয়ে কিছু করতে, নাকি acid attack নিয়ে লেখাটা তোর কাছে সাহিত্যের অপমান..??”
কোন ভাষা খুঁজে পেলো না বলার মত, তাই চুপচাপ উঠে বাড়ি ফিরে এল অন্বেষ।
বাড়ী ফিরেই লিখতে বসল কবিতা, মিশুক অশ্রাব্য, তবু সে আজ প্রতিবাদ করবে, সে যতটুকু পারে, ততটুকুই করবে।

::(৫)::

“বরানগর সুকান্ত পল্লীর acid attack নিয়ে কবিতা লিখে সাড়া ফেলল এক যুবক।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল জনপ্রিয় এই লেখাটি প্রায় সমগ্র যুব সমাজকে একজায়গায় এনেছে।
প্রতিবাদের ঝড়ে প্রশাসনও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে।
স্বয়ং নারী কল্যান সুরক্ষা মন্ত্রীর তৎপরতায় দুজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে বরানগন থানা।
বিখ্যাত কবি বিধুভূষণ সেনের নাতি অন্বেষ সেন সাহিত্য দিয়ে ঘটিয়েছে এক অদ্ভুত বিপ্লব।
এক মাসের মধ্যেই খবরের কাগজ আর tv চ্যানেল গুলো এই খবর টা দিনরাত মাতামাতি আরম্ভ করে দিল।
আবার সেই ভুবনমোহিনী হাসি ফিরে এলো দেবামিতার মুখে,
ভীষণ এক শান্তিতে সব জ্বালা যেন তার জুড়িয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছে নিমেষে।
অন্যদিকে অন্বেষকেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি গ্রাস করে… হয়ত অশ্রাব্য রচনার জন্যই।।

Show More

Related Articles

One Comment

  1. অনেকদিন পর বাস্তবকে নিয়ে এমন বাস্তবতা চোখে পড়ল। অসাধরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker