fbpx

সেন-শর্মা

পাশাপাশি সেন-শর্মা বাড়ি । বাড়ির বাইরের গেট, রং চঙে দেয়াল, বারান্দার বাগান সজ্জা আর অন্দর সজ্জায় যেন একে অপরকে সবসময়ই টেক্কা দিয়ে চলেছে। তফাৎ অবশ্য কিছু আছে একটি বাড়ির মেন গেটের সামনে বড় বড় পাথর কেটে লেখা ‘সেন ভবন’ আর অপরটিতে লেখা রয়েছে ‘শর্মা প্যালেস’। তবে এই দুই বাড়ির একে অপরের প্রতি ঈর্ষাটা যেন বাড়ির লোকেদের থেকেই শেখা। দুই বাড়ির প্রতিটা সদস্যই অপরপক্ষকে দেখে চোখে গঙ্গাজল ছেটায় ,এমনি মধুর সম্পর্ক আর কি! কিন্তু এই তিক্ত-বিষময় সম্পর্কের পিছনের ইতিহাসটা আমার ঠিক জানা নেই। শুধু আমারই নয় পাড়ার কারোরই এই বিষয়টা সম্পর্কে বোধহয় সঠিক ধারণা ছিল না। তবে জানতে আগ্রহী যে কেউই হননি, তা কিন্তু কি একেবারেই নয়। কিন্তু জানতে চাওয়ায় সেন-শর্মা দুপক্ষের তরফ থেকে তাকে এতটাই তিরস্কার শুনতে হয়েছে যে বেচারাকে লজ্জায় দশ দিন আর পাড়ায় বেরোতে দেখা যায়নি।

এই দুই সেন-শর্মা বাড়ির দুই সদস্যের মধ্যেই গড়ে উঠল গভীর ভাব। ক্রমে এই ভাবই পরিবর্তিত হল ভালোলাগায় এবং ধীরে ধীরে ভালোবাসায়। একজন হল সেন বাড়ির নয়নের মনি সবার প্রিয় শান্ত, নম্র ,ভদ্র ছোট কন্যাটি আর অপরজন শর্মা বাড়ির সুপুত্র। একজনের টানা টানা চোখ, সদ্য যৌবনা চেহারার বাড়বাড়ন্তে বাড়িতে যেন সব সময় সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পরছে। আর অপরজনের সুঠাম দেহ, তীক্ষ্ণ নজর, উদ্দাম গতি যেন সেই বাড়ির লোকেদেরকেও সর্বদা ব্যস্ত করে রেখেছে। এই রূপ দুই বিপরীতলিঙ্গের মাঝখানে একটি মূর্খ পাঁচিল কতদিনই বা ব্যবধান সৃষ্টি করে রাখতে পারে? সুতরাং যা হবার তা হয়েই গেল…

সকালে ঘুম থেকে ভোর চারটেয় উঠেই শুরু হয় সেনবাড়ির ছোট কন্যার রেওয়াজ। “কদিন ধরেই যেন গলাটা চড়া লাগছে”, বলে উঠলো ছোট কাকা,” উফ্ কি আওয়াজ ,বলি এত চেঁচাচ্ছে কেন”?” বাহ রে !এটাকি চেঁচানো নাকি?কত সুন্দর স্বর বলোতো,আমিতো স্বপ্নেও শুনতে পাই মাঝেমাঝে”,হেসে বলে কাকিমা।
আর শর্মা প্যালেসে তখন এই রেওয়াজ নিয়ে গোল টেবিল বৈঠক বসে গেছে। বড় জেঠু এসেই বলল” আর তো পারা যায় না। রোজ সকালে উঠে কি কানের ভেতর কামান ফাটবে? বলি পাড়ার লোক থাকে কিকরে এর কি কোনো প্রতিবাদ হবেনা?” জেঠিমা মিনমিন করে বলল,” আমি কি জানি তুমিই বাবাকে গিয়ে বল”….. ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু সবাই ভর্ৎসনায় ফেটে পড়লেও কম্বলের আড়াল থেকে একজনের মুখে তখন প্রেমের আভা ঝলসে উঠছে, আনন্দে টগবগ করে ফুটছে মন। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে চারিদিকে চেয়ে লম্বা হয়ে হাই তুলে তবেই বিছানা ছাড়বে সে। এটিই হলো তাদের দুজনের মধ্যে নিরব ‘সুপ্রভাত সম্ভাষণ’।

এভাবেই কাটছে দিন। সেন-শর্মা দুই বাড়িরই বড়দের চোখ এড়িয়ে যেটুকু ফাঁক-ফোকোর পেয়ে একটু কাছাকাছি আসা যায়…তাইই সই। কিন্তু তাতেও ভয়। কেউ দেখে নিল নাতো…
দুপুরে সকলে ঘুমিয়ে পড়ার পর, কন্যের যেন আর চোখই বন্ধ হয় না। চুপিচুপি টুপলুর পাশ থেকে উঠে দরজাটা ফাঁক করে চারিদিকে দেখেই, এক ছুটে চলে আসে বাগানের পাঁচিলের ধারে। একটা ছোট ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়েই দেখা করে ওরা। ফিসফিসানির শব্দও যাতে কেউ শুনতে না পায় তাই চোখে চোখেই কথা সাড়ে তারা। আর রোববার হলে তো কোনো কথাই নেই , সকাল থেকেই দুজনের হালকা মেজাজ আর সদাহাস্য বদন। কেনই বা হবে না, ওই দিনই তো খালি পরস্পরের কাছাকাছি এসে দেখা সাক্ষাৎ হয়। রবিবার সেন বাড়ির মিষ্টি দিদির গিটারের ক্লাস, পার্কের পাশের রাস্তা দিয়ে পথ আর ওই পার্কেই তো দাদুর সাথে মর্নিং ওয়াক সারতে আসতে হয় আমাদের দুষ্টু প্রেমিককে।

বাবা…রবিবার সকাল থেকেই দাদুর ঘরে প্রায় বারো-তেরো বার তার যাতায়াত শুরু হয়ে যায়। ধুতির কোঁচাটা ভালোভাবে গোঁজার আগেই টেনে নিয়ে যায় পার্কের দিকে…কি জানি! যদি মিস হয়ে যায়। নাহ্…মিস অবশ্যি কোনদিনই হয়না, দেরি হলেও কোনো না কোনো অজুহাতে মিষ্টি দিদিকে পার্কে আটকে রেখে দৌড় করায় আমাদের লাজুক প্রেমিকাটি। কিন্তু দাদুর মনে সন্দেহ, ব্যাপার কি! সারা সপ্তাহ মর্নিং ওয়াক যেতে হলে বাবুর ঘুম ভাঙ্গে না, আর রবিবার হলেই হলো, মর্নিং ওয়াক যাবার জন্য এত ছটফটানি; নিশ্চয়ই ‘ডাল মে কুছ কালা হে’।

না আর চাপা থাকলো না। সেন-শর্মা দুবাড়ির কারোর নজরেই এই প্রেম পর্ব ধরা না পড়লেও পাড়ার লোকের নজর এড়ালো না ।রাস্তায় ,গলিতে, পুকুরের পাড়ে প্রায়ই তো আজকাল দুজনকে একসাথে দেখা যাচ্ছে। পাড়ার লোকের তো এতক্ষণে চোখ কপালে,” বল কিগো? সেন বাড়ির মেয়ে আর শর্মা বাড়ির ছেলে? হায় হায় হায়…! এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি”? সত্যি কথাটা কদিনের মধ্যে ছেলে থেকে বুড়ো সকলের মুখে মুখে চাউর হয়ে গেল। ফুটবল মাঠে ছেলেদের ,পাড়ার মাচায় ছোকরাদের ,তাসের আড্ডার বুড়োদের, বিকেলের ছাদে পড়ন্ত রোদে স্ত্রীলোকদের আর স্নানের ঘাটে ঝিদের মধ্যে একমাত্র আলোচনার বিষয় হয়ে উঠলো এই বহুল চর্চিত প্রেমগাথা। অচিরেই বসন্ত জেঠুর কাছ থেকে এই কথাটি জানতে পারল শর্মা বাড়ির বড়কর্তা।শুনেই তো হৃদপিণ্ডটা লাফিয়ে উঠে ধরাশায়ী বড়কর্তা, জল টল দিয়ে যখন জ্ঞান ফিরলো তখন মুখ দিয়ে শুধু একটাই কথা বেরোলো, ‘মর্কট, বেল্লিক, ছুঁচো দুধ কলা দিয়ে এতদিন কালসাপ পুষেছি’। বলেই তো ভর্ৎসনা, তিরস্কার,গালাগালির সাথে বারো ঘা জুতোর বারি খেয়ে রসিক নাগরের এখন মুখ ফুলে ঢোল।আর সেন বাড়ির কন্যের কথা আর কি বলব বাড়ির বড়দের সামনে আর মুখ তুলে তাকাতেই পারছে না লজ্জায়। মিষ্টি দিদির কোলে ঘাড় গুঁজে শুয়ে আছে সেই থেকে। তার কপালে অবশ্যই মার জোটেনি কিন্তু মেজো কাকা বলেছে “সাত দিনের মধ্যে অন্য ছেলে দেখে বিয়ে দিতেই হবে ছিঃছিঃছিঃ সেন বাড়ির মান সম্মান একেবারে ধুলোয় মিশিয়ে দিল?”

এখানেই শেষ নয়। এই ঘটনার চব্বিশ ঘন্টাও কাটল না। সেদিন মাঝরাতে অনিক চিন্তা করে পুত্র এসে দাঁড়ালো বাগানের ঘুলঘুলিটার সামনে।এসেই তো চমকে উঠল, কন্যে যে অনেক আগে থেকে সেখানে এসে হাজির। কি জানি কেমন করে জানল? একেই হয়তো বলে প্রেমের টান। সে যাই হোক,আজ কিন্তু কারোরই বুক দুরুদুরু নয়, চোখে ভয় নেই…বরং তীব্র প্রতিবাদ। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর একটুখানি ফিসফিসানি, ব্যাস আবার যে যার ঘরে ফিরে এল। পরদিন সকালে সবার ঘুম ভাঙলো শর্মা বাড়ির জেঠিমার হাঁকডাকে, “এত ডাকাডাকির পরও নাকি সুপুত্তুরের ঘুম ভাঙেনি”। চুপটি করে এক জায়গায় ঠায় বসে আছে, নড়ছেই না। জেঠু এল, বুকের কাছে মাথা নিয়ে পরীক্ষা করল ‘নাহ্…বেঁচেই তো আছে’। তবে উঠছে না কেন? জেঠিমা ভয়ে চিৎকার করে উঠলো। এদিকে সেন বাড়িতেও সেই একই অবস্থা, যে মেয়ে বাবা দাদার ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে থাকতো, সে কিনা অবাধ্য হয়ে ঠায় বসে আছে। খেতে দিলেও দাঁতে কাটছে না কিচ্ছুটি। সবাই তো অবাক।

তিন দিন কাটল এভাবে। দুজনেরই টানা উপোস। ডাক্তার এলো বলে গেল, যে করেই হোক খাওয়াতেই হবে , নইলে আর আশা নেই। জেঠিমা কেঁদে গিয়ে পড়ল ঠাকুরঘরে তারপর দাদুর কাছে, “বাবা যে করেই হোক ওকে বাঁচান নইলে আমি গলায় দড়ি দেবো”। এদিকে সেন বাড়ির মিষ্টি দিদি আর মেজো কাকিও বেঁকে বসলো। “তোমাদের দুই বাড়ি যেতে যদি আমাদের মেয়ে হারায় তবে আমরাও বাড়ি ছাড়বো…” ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রথম প্রথম দুবাড়ির পুরুষেরা কেউই নিজেদের আত্মসম্মান খোয়াতে নারাজ। কিন্তু পরিস্থিতি আরও বেসামাল হওয়ায় তারাও নড়ে বসলো। এবার তো ঠাকুমা সুর তুলেছে, “আগে দুটির বিয়ে দিয়ে প্রানে বাঁচাও নাহলে বিষ খাবো। কতদিন ওই গলার একটা আওয়াজও শুনিনি, চুপ মেরে পাথর হয়ে গেছে একেবারে”। দাদু আর স্থির থাকতে পারল না শেষমেষ ঠাকুমার প্রস্তাবে রাজি হল। কিন্তু প্রশ্নটা হল, সেন-শর্মা এই দুবাড়ির মধ্যে কথাটা তুলবে কে? ওদেরতো নিজেদেরই কথা বন্ধ। অনেক জল্পনাকল্পনার পর শর্মা বাড়ির লোকেরাই এগিয়ে এল প্রস্তাব রাখতে। সেন বাড়ির লোকেরা তো সেই আশাতেই ছিল, শুনেই এককথায় রাজি। দেনাপাওনা, দিনক্ষণ, নগদ পাঁচ হাজার টাকা, গয়না সব ঠিক হয়ে গেল। কন্যের মুখে এবার বেশ হাসি ফুটেছে, খেতেও শুরু করেছে। কিন্তু সমস্যা হল ছেলেকে নিয়ে,ছেলের মেজাজ একেবারেই ভালো নেই। সেই একইরকম মুখে কোনো কথা নেই, সবাই মিলে কত চেষ্টা করছে তবু মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। দেখতে দেখতে আশীর্বাদ হয়ে গেল তবু মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোলো না। তবে হ্যাঁ,একটু একটু করে খেতে শুরু করেছিল আগেই।

সেন-শর্মা দুবাড়ির সবাই ই তো খুব চিন্তা করছে। দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেল আর তো অপেক্ষা করা যায় না। এবার সবাই মিলে ভেবেচিন্তে মেয়েকেই পাঠানো হল ছেলের কাছে। একবার, দুবার, তিনবার…নাহ্ বারবার গিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। ছেলে ঠিক মুখ বেঁকিয়ে ঘাড় গুঁজে বসে আছে, মুখে কথা নেই। জেঠিমা বলল, “তোর এত অভিমান সবই তো তোদের ইচ্ছাতেই হচ্ছে, একবার কথা বল বাবা”। না,তাতেও কোন কাজ হলোনা। বিয়েও হয়ে গেল, সাড়ে ছ’শ লোক। মাছ, মাংস, পোলাও, কোরমা, সন্দেশ, রসবড়া, আইসক্রিম কিনা নেই। প্রত্যেকেই নববধূর সঙ্গে সেলফি তুললো ও গিফট দিয়ে বর-বউকে অনেক অনেক আশীর্বাদ করে গেল। কিন্তু ঠাকুমার চিন্তা বাড়লো কাল যে বৌভাত ,কথা না বললে ছেলে নতুন বউয়ের ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নেবে কিভাবে? বউ ভাতের দিন সকালে, নতুন বউকে নিয়ে আসা হল ঘি ভাত পরিবেশন করবে বলে। সবার পাতে ঘি দিয়ে নতুন বউ যেই বরের পাতে ঘি দিয়েছে, অমনি বর তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো ভউউউউউউউউউউউ ভউ ভউ ভউউউউ করে।

শুনেই তো সেন-শর্মা বাড়ির সবাই যে যেখানে ছিল ছুটে এলো। রায় বাড়ির লোক, মিত্তির বাড়ি, দে বাড়ি, মুখার্জিদের বাড়ি পাড়ার সবার মুখে তখন একটাই কথা “ডেকেছে, ডেকেছে ওই শোনো ডেকেছে”। চল চল চল… করে যে যেখানে ছিল দৌড়ে এলো। সবার মুখে তখন একটাই প্রশ্ন,” কি ব্যাপার এতদিন পর ডাকলো যে”? তখন জেঠিমা একগাল হেসে উত্তর দিলো হবেই তো, “কুকুরের পেটে যে ঘি সহ্য হয় না”।

Leave a Reply