fbpx
I got a story to tell

চিরসখা

(১)
‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল,করে মলিন মর্ম মুছায়ে’
চান্দ্রেয়ী দেবীর গানের সাথেই ‘বেলাশেষে’-র সকলের আরো একটি দিন শুরু হল৷ এ শহরে’বেলাশেষে’ এখন এক বিখ্যাত বৃদ্ধাশ্রম৷ কর্ণধার সুজনবাবু এখানকার বাসিন্দাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের দিকে বরাবর ই নজর দেন৷ যথাযথ মানের খাওয়া দাওয়া ,সুচিকিত্সা ,মাসে একদিন সিনেমা দেখা,বাত্‌সরিক পিকনিক আরো কত কি..
(২)
‘মা,তোমার চা এনিছি’-বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো শ্যামলী,এখানকার সবার নয়নের মণি,সবার দেখাশোনা করে ও৷ চান্দ্রেয়ী দেবী বললেন -হ্যাঁ রে আজকের খবরের কাগজটা কই?
-ও তো ওই নতুন যিনি এয়েচেন তার ঘরে৷
-আচ্ছা তুই আয়৷
পায়ে পায়ে তিনি এগোলেন নির্মলা দির ঘরের দিকে৷ এই মানুষ টাকে বেশ ভালো৷সারাজীবন দাপটে সংসার করেছেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজেই এসেছেন এখানে৷ আর চান্দ্রেয়ী দেবীও ছিলেন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ,অবসরের পরে এখানে এসেছেন,পেনশনের মোটা অংশ এখনও বাড়িতে পাঠান৷
-ও নির্মলা দি কি করছ? চলো বাগানটা দেখে আসি,গাছগুলোর কতটা কি হলো, বলতে বলতে ঘরে ঢুকে দেখলেন ঘর ফাঁকা৷ চান্দ্রেয়ী দেবী ও ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানের দিকে যাচ্ছেন এমনসময় প্রভাত বাবু এসে বললেন-এই চান্দ্রেয়ী,আজ ভোরে যিনি এলেন আমরা সবাই তার ঘরে,তোকে ডাকতে এলাম৷ চল৷
খানিকটা দোনোমনো করেই সেই নতুন ব্যক্তির ঘরের দিকে পা বাড়ালেন চান্দ্রেয়ী দেবী৷ এভাবে যেচে আলাপে তিনি চিরকালই অস্বস্তিতে পড়েন৷
(৩)
-যা বলেছেন মশাই,এই মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়ে তর্ক কখনো থামবেনা৷
-তুই আর কথা বলিসনা বিকাশ,শেষ কবে তোরা ‘কলকাতা লীগ’পেয়েছিস বলতো?মনে রাখিস চিংড়ি মেরুদণ্ডহীন৷
-বিকাশদা তুমি কিন্তু.. আচ্ছা আচ্ছা আপনারা তো এলেন আমার সাথে গল্প করতে,আর নিজেরা ঝগড়া করছেন বিকাশবাবু?
-হ! এইডা এক্কেরে হক কথা কইলেন৷বাদ দ্যান অগো কথা৷আমি হইলুম গিয়া ধনঞ্জয় বিশ্বাস ,এহানকার সবথেকে বেশী বুড়া,তবে এহনও দিব্য ফিট,এইডা অবিনাশ,প্রভাত রে তো আগেই দ্যাখলেন,
-আমি মনোজ আর ও জোসেফ, আর ইনি হলেন প্রতিমা দেবী
-নমস্কার
-হ্যাঁ দাদা দেখবেন আপনার খুব ভালো লাগবে এখানে৷এ হলো তপতীদি,মানসী, আর নির্মলা দি৷আর বাকিরা নানা কাজে৷
এই যে আরেকজন এলেন,বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন প্রভাত বাবু৷ তার পিছনে চান্দ্রেয়ী দেবী ঘরের চৌকাঠে সেই ভীষণ চেনা চোখ দুটো দেখে থমকে গেলেন৷
এভাবেও ফিরে আসা যায়?
(৪)
-তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না,সব কিছু ছাড়তে রাজি আমি ৷ কিন্ত তোমাকে না পেলে সব মিথ্যে ইকবাল ৷
-তোকে ছাড়া আমিই থাকতে পারব?জীবন টাযে তোর নামেই লিখেছি চান্দ্রেয়ী ৷
আরো একবার মিশে গেছিল শরীর দুটো৷ সেদিন বাড়ি ফেরার পরই সব জানাজানি হয়ে গেছিল৷ মারধোর কিছুই বাদ যায়নি৷ ওদিকে ইকবালের বাবাও সেসময়ের গোঁড়া মুসলিম৷ না ওরা কেউ ই সেদিন কিছু করতে পারেনি৷বাবার চাপে ইকবাল বাধ্য হয় বিদেশে পড়তে চলে যেতে,ওখানেই থেমে যায় একটা ১৮ আর ২২ বছরের স্বপ্ন৷সেই দিনের চিহ্ন হিসাবে চান্দ্রেয়ীর গর্ভে সন্তান আসে,না চান্দ্রেয়ী ওকেও রাখতে পারেনি৷ এরপর সে পুরোপুরি গুটিয়ে নেয় নিজেকে ,নিমগ্ন করে পড়াশোনায়,চাকরি পায়,শত অনুরোধেও বিয়েটা করেনি৷ ভাইয়ের সংসারে গলগ্রহ হবে না বলেই এখানে এসেছে..
সেই সময় গুলো তখন থেকে চোখের সামনে ভাসছে,দুপুরবেলা খেতেও যেতে পারেনি৷কিন্তু ইকবাল এখানে কেন? খুব ইচ্ছে করছে ওর সাথে কথা বলতে,কিন্তু এখন এভাবে গেলে সেটা খারাপ দেখায়৷
-কিরে চন্দু,ঘর অন্ধকার কেন?দুপুরে খেতে গেলিনা,কি হয়েছে ?
-কিছুনারে খুব মাথা ধরেছিল৷
-চল সন্ধ্যারতির সময় হলো তো
-হ্যাঁ চল
(৫)
চান্দ্রেয়ীকে এখানে এভাবে দেখবো ভাবিওনি৷ কত বদলে গেছে ও৷ কিন্তু ও স্বামী সন্তান ছেড়ে এখানে কি করছে?সত্যিই জীবন কি আজব রঙ্গমঞ্চ!যেখানে দুজনের সবটুকু ভাগ করে নেয়ার কথা ছিল সেখানে সবই কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো৷ আজকালকার প্রজন্ম সত্যিই কত এগিয়ে গেছে, বিদেশে তো বটেই,এমনকী ভারতেও প্রাক বিবাহ যৌনতা কোন ব্যাপার না এখন আর,সমকামীতাও জায়গা করে নিচ্ছে,এই প্রজন্ম কত দক্ষ ভাবে সব সামলায়,অথচ তাদের সময়…
-বলি ও ইকবাল বাবু,আমাদের এখানে সন্ধ্যাবেলা আরতি হয়,তারপর একটু সান্ধ্যভ্রমণে যাই সকলে,চলুন
-বিপিনবাবু,আজ অনেকটা journey করে এসেছি,বড় ক্লান্ত আর তাছাড়া আমি তো..
-আরে ধুর মশাই এখানে ওসব মানা হয়না৷যোসেফ ও সব কাজ করে৷আচ্ছা বিশ্রাম নিন
(৬)
মন্দিরে বারবার চান্দ্রেয়ী দেবীর চোখ খুঁজছিল তাকে৷নির্মলা দেবী ধমক দিলেন,এই চন্দু,কি দেখছিস এদিক সেদিক?
-না ওই নতুন ভদ্রলোক এলেন না?
-ও ইকবাল আজ খুব ক্লান্ত
-উনি কোথা থেকে এসেছেন?
-বলি তোর হলো কি!সম্বন্ধ করবো?
-ধ্যাত তোমরা না…
নাহ!রাতেও ইকবাল আসেনি!আজ আর ‘বেলাশেষে’র দুই বাসিন্দার চোখে হয়তো ঘুম নামবে না৷
(৭)
-কেমন আছো ইকবাল?তুমি এখানে কেন?বিয়ে করোনি?আর এতদিন ছিলেই বা কোথায় ?
-ওরে বাবা! এতগুলো প্রশ্ন !একটা একটা করে বলছি৷
যেভাবে জীবন রেখেছে সেভাবেই আছি৷বিদেশেই ছিলাম৷২ মাস আগে এলাম৷আব্বা আম্মু তো কবেই….পিছুটান ছিলোনা৷
-মানে তুমি !!
-নারে,বিয়েটা অনেকদিন আগে ছাতিমপুরের এক সন্ধ্যাবেলা বটতলায় হয়েছিল৷
-ইকবাল…
-হ্যাঁ ,আব্বা তখন জোর করে বাইরে পাঠিয়ে দিল,তোর সাথে যোগাযোগ ছিল অসম্ভব৷এতগুলো বছরে কত মেয়েকে দেখলাম ,কিন্তু ‘তুই’টার অভাব ছিল
-জীবন খুব কঠিন ইকবাল৷বাবা মা খুব জোর করত বিয়ের জন্য ৷পাত্রপক্ষের সম্মুখীনও হয়েছি,কিন্তু আমার সেই ‘দুরন্ত পুরুষ’ কে পাইনি৷
-কাল সারারাত এসবই ভেবেছি জানিস
-হয়তো এটাই ভবিতব্য ছিল আমাদের
-হয়তো…
-চলো এবার ,হাঁটতে হাটতে অনেকদূর এসে গেছি৷আজকাল সন্ধ্যাবেলা বেশ ভালোই ঠান্ডা পড়ে

(৮)
একমাস পর….

এখন সকালের প্রাতঃভ্রমণ থেকে সন্ধ্যার পায়চারি সবেতেই চান্দ্রেয়ী দেবীর সঙ্গী এখন ইকবাল বাবু৷ ওরা দুজনে জীবনের বেলাশেষে আরো একবার খুঁজে পেয়েছে নিজেদের৷সবাই বলেছিল আইনি স্বীকৃতির কথা,ওরাই রাজি হয়নি৷এই বয়সের নির্ভরতা তো আর শুধু ২টো সইয়ের উপর নির্ভর করেনা৷ আবার যে কখনও দেখা হবে সেটাই তো ভাবেননি ৷তাই তারা এভাবেই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চান৷ প্রেম শুধু শরীর ছুঁয়ে হয়না,মনের প্রেম অনেক বেশী শান্তি দেয়৷৪৪বছর আগের ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আটকে যাওয়া প্রেম টা আজ এক নতুন পূর্ণতা পেল৷’বেলাশেষে’ও সূর্যের স্নিগ্ধকিরণ ছুঁয়ে গেছে ওদের৷

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close

Adblock Detected

Hi, In order to promote brands and help LaughaLaughi survive in this competitive market, we have designed our website to show minimal ads without interrupting your reading and provide a seamless experience at your fingertips.