কেন মেঘ আসে (পর্ব- ২)

একাই বের হলাম সাইকেলটা নিয়ে। মোড়ের দোকানে বসে এককাপ চা আর দুটো বেকারি বিস্কুট, সাথে নেভিকাট ধরিয়ে জোরে একটা টান দিলাম-
সত্যিই সম্পর্কের প্রথম দিকের দিনগুলো মন্দ কাটেনি। অনু ফুচকা খেতে ভালবাসতো না তবে আইসক্রিম দেখলেই মন গলে যেত নিমেষে। খেতে ভালোবাসি দুজনেই তাই দেখা করা মানেই আমাদের কাছে ছিল রোল, কাবাব থেকে শুরু করে নিদেন পক্ষে একপ্লেট করে মোমো গলাধঃকরণ করে আসা। অনু জানতো আমার পকেটের উষ্ণতা, তাই আমাকে সেভাবে খরচ করতে দিত না কোনোদিন। আমি চাইতাম না তবুও মাসের শুরুতে মোবাইলে ব্যালেন্স ভরে দিত, নেটপ্যাক রিচার্জ করে দিত। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় এসব বলতে সাহস হতো না, ভয় হতো যদি ভুল করেও ওরা পরনির্ভরশীল ভেবে বসে…
আমার শুধু খরচ বলতে ছিল দেখা করার দিন একটা আইসক্রিমের বাটি, আর বাজার শেষে যদি কিছু টাকা বাঁচাতে পারি, তবে একটা কর্ণেটো।
সবই ঠিকঠাক চলছিল। বিয়ের প্ল্যানিংও করে রেখেছিলাম মনে মনে, ঠিক করেছিলাম দুটো বাচ্চা হবে আর দুটোই মেয়ে। এখন ওসব ভেবে হাসিও পাচ্ছে আবার একটু একটু কান্নাও পাচ্ছে।
সবই তো ঠিক ছিল, যদি না মেঘ এসে মাঝখানে একটা দেওয়াল তুলে দিত!

আবার রক্ত গরম হয়ে উঠলো, এসব ভাবতে ভাবতে আগুন কখন ফিল্টার অবধি এসে পৌঁছেছে বুঝতেই পারিনি। সাইকেলটা নিয়ে সোজা বাড়ি ঢুকলাম। এবার কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আগে যতবার ঝগড়া হয়েছে, ততবার কিছুক্ষণ পরই কখনও আমি সরি লিখে পাঠিয়েছি অনুর ইনবক্সে তো কখনও অনু আমায় পিং করেছে আদুরে গলায়। ঝগড়া শেষে দুজনেই প্রতিবার প্রমিস করেছি যে আমাদের মধ্যে মেঘকে আর কখনও আনবো না। কিন্তু বিগত কয়েকদিন ধরে যে কারণেই কথা কাটাকাটি হোক, বিষয়টা সেই ঘুরেফিরে মেঘ-এই এসে দাঁড়ায়। সত্যিকথা বলতে অনুর অন্যকোনো বন্ধুবান্ধব নিয়ে আমার কোনো সমস্যা ছিল না, মেঘকে নিয়েও না, এটা জানা সত্ত্বেও যে মেঘ বছর দেড়েক আগে অনুকে প্রপোজ করেছিল। অনু মেঘকে সেভাবে না করতে পারেনি কিন্তু বলে দিয়েছিল বন্ধু ছাড়া ওকে অন্য চোখে দেখবেনা কোনোদিন। তারপরই নাকি অনুর প্রতি মেঘের ক্রাশ ব্যাপারটা মরে যায়। আর বন্ধত্বটা গভীর হতে হতে ওরা বেস্টফ্রেন্ড হয়ে যায়।

অনু যদি মেঘকেই ভালোবেসে থাকে তবে আমাকে মাঝে আনলো কেন? একবাটি আইসক্রিমের জন্যে? অনু তো চাইলেই মেঘ ওর জন্যে অ্যাভেইলেবেল হয়ে যেত, আর মেঘের বাবার যা ইনকাম তাতে একটা কেন দুটো আইসক্রিমের দোকান গিফট করতে পারতো সে অনুকে। মেয়েরা যে কখন কি ভাবে ভগবানও তা হয়তো বলতে পারে না।

মোবাইলটা হাতে নিতে ডাটা অন করলাম। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখি অনু আরও তিনটে ছবি পাঠিয়েছে। এবারে অনু আগে দাঁড়িয়ে আর পেছনে ওই কাবাবের হাড্ডিটা দাঁত কেলিয়ে হাসছে। দেখলাম ডিপি চেঞ্জ করেছে- ডিপিতে অনুর কাজলমাখা চোখ। ছবিটা মেঘের ডিএসএলআরে তোলা, মেঘই এডিট করেছে। কাজল পড়লে অনুকে খুব সুন্দর দেখায়। দেখাবে নাই বা কেন? অনুর চোখগুলো অনেক বড়। বন্ধুরা তো ভাবতোই, আমিও মাঝে মাঝে ভাবতাম যে এত সুন্দরী মেয়ে আমার প্রেমে পড়ল কীভাবে? আমি যেখানে এখনও সাজগোজ বলতে একটুখানি পাউডার আর পন্ডস ক্রিম বুঝি।
হোয়াটস্যাপ স্ট্যাটাসে চোখ পড়তেই মাথা ভীষণ গরম হয়ে গেল। মহারানী স্ট্যাটাস দিয়েছে – ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে’। মেঘের কোলে বসে কে হাসল কে কাঁদলো তাতে ওর কি?
আর এই ভরা সন্ধ্যেয় ও রোদ পায় কোত্থেকে? ইচ্ছে হল একটা জবরদস্ত রিপ্লাই দিই, কিন্তু সবই এখন অনধিকার চর্চার মধ্যে পড়ে। আর অনুকে এখন আমি আমার বলে দাবি করতে পারি না। তাই ওর যা খুশি ও করুক। ঠিক করলাম আমি কোনওরকম রেসপন্স করবো না, ব্লক করার কথা মাথায় এসেছিল কিন্তু কোথাও একটা পড়েছিলাম- ব্লক করা মানে একরকম হেরে যাওয়া। আর আমি হারতে চাই না ওর কাছে, আমি হারতে চাই না মেঘের কাছে। ছবিগুলো আবার শুধু সিন করেই রেখে দিলাম,
আমার হোয়াটসঅ্যাপের স্ট্যাটাসটাও একই রাখলাম শুধু রোনাল্ডোর ছবিটা পালটে ডিপি করলাম- রিয়াল মাদ্রিদের লোগো।

Comments

comments

Post Author: Samrat Sarkar

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *